1. মিলান, ইতালি – 10 ঘন্টার ট্রানসিট ছিল বার্সেলোনা যাওয়ার পথে. তো এক বন্ধুর সাথে ঠিক করলাম মিলান ঘুরে দেখবো. এয়ারপোর্ট শাটল নিয়ে গেলাম মিলান স্টেশনে. নেমে প্রথমেই এক বাংলাদেশী চোখে পড়লো. দেখলাম সে কিছু খেলনা বিক্রি করছে. একটু হাঁঠতেই চারপাশে শুধু বাংলাদেশী আর বাংলাদেশী দেখলাম. মনে হলো না ইতালির কোনো শহরে এসেছি. ঘুরাঘুরির পর এক ছোট বাংলাদেশী রেস্টুরেন্টে ঢুকলাম. ভদ্রলোক চিটাগংয়ের. কথায় কথায় বললো উনি বাংলাদেশে ল’ পাশ করে প্রাকটিস করতেন. সব ছেড়ে ইতালি এসেছিলেন সেটেল হয়ে নিজের ও পরিবার এর জন্য কিছু করার উদ্দেশে. কিছুই পারলেন না, শেষমেশ একটি ছোট রেস্টুরেন্ট দিয়েই চালাচ্ছেন. জিজ্ঞেস করলাম, “দেশে কি জানে?”. বললেন, “কি জানাবো ভাই, জানানোর কিছুই নাই.”
২. স্টকহলম, সুইডেন – বেশ কিছু বাংলাদেশী বন্ধুর সাথে বসে ম্যাকডোনাল্ডে আড্ডা দিচ্ছি. পরে চলে যাওয়ার সময় ওখানে কাউন্টারে কাজ করা এক লোক এসে বললো, “ভাই কি বাংলাদেশী?” বললাম, “জি, আপনিও?”. তো কথায় কথায় জিজ্ঞেস করলাম, “কতদিন ধরে এখানে?”, বললেন ,”ভাই প্রায় আট বছর. ছাত্র হিসেবে এসেছিলাম, 30 ক্রেডিট করার পর চাকরি খুঁজি. তারপর থেকে এখানেই পেয়ে এখানেই কাজ করছি. PR ও পরে হয়ে গেসে”.
3. মাদ্রিদ, স্পেন – চাকরি-জনিত কারণে আসা হয়েছিল গত মাস. রবিবার শহর ঘুরে দেখার সিদ্ধান্ত নিলাম. যেমন কথা, তেমন কাজ. একটি প্ল্যান তৈরি করে গেলাম যে কি কি দেখার আছে, সব দেখবো. ঘুরতে ঘুরতে একটি মিশরী টেম্পল এসে পৌছালাম. মাদ্রিদের বেশ উচা একটা এলাকা. দেখলাম টুরিস্ট দিয়ে ভরা. কিছুক্ষন পর এক লোককে দেখলাম পানি বিক্রি করতে. ডাক দিয়ে বললাম, “1 bottle please.” সে বোতল বের করে দেয়ার সময় জিজ্ঞেস করলাম, “Where are you from?”. উত্তর তাই এলো যেটা ভাবতেছিলাম, “বাংলাদেশী”. জিজ্ঞেস করলাম, “আচ্ছা.. তো কবে থেকে এখানে?”, বললেন, “বেশ কয়েকদিন.” 1 ইউরো দিয়ে পানি কিনে চলে যাওয়ার সময়ে বললেন, “দেখতেই পারতেসেন তো ভাই আমাদের বাংলাদেশিদের কি অবস্থা.”
4. কোপেনহেগেন, ডেন্ মার্ক্ – কয়েকটা বন্ধুর সাথে আড্ডা দিচ্ছিলাম বার্গার কিংয়ে. অনেক হাসি ঠাট্টার মধ্যে বেশ কয়েকজন স্টাফ কে দেখলাম এসে এদিকসেদিক পরিষ্কার করতে. তাদের মধ্যে একজন বাংলাদেশিও ছিল. বেশ কিছুক্ষন পর উনি আমাদের দিকে এসে আলাপ শুরু করলেন. কথায় কথায় জানতে পারলাম ভদ্রলোক মাস্টার্স পাশ. দেশে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে ভালো চাকরি করতেন. ভালোভাবেই যাচ্ছিলো দিনকাল, পরে সব ছেড়ে ডেনমার্কের গ্রীন কার্ড পাওয়ার উদ্দেশ্যে পারি জমান এখানে. তারপর থেকেই কষ্ট করে যাচ্ছেন. এক পর্যায়ে বললেন, “দেশেই ভালো ছিলাম ভাই, ভালো একটা চাকরি আর জীবন ছিল.”
* সুইডেন এ এসেছিলাম মাস্টার্স করার জন্য. ঠিক সেই বছরেই Swedish Institute তাদের Digital Ambassador প্রোগ্রাম চালু করে. উদ্দেশ্য ছিল বিদেশী স্টুডেন্টদের নিয়ে একটি টীম তৈরী করা যারা সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে সুইডেনের উচ্চশিক্ষা বিশ্বের কাছে তুলে ধরবে এবং এপ্লিকেশন থেকে শুরু করে স্কলারশিপ পর্যন্ত সবরকমের তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করবে. যাই হোক, সেই প্রোগ্রামে আমার সিলেকশন হয়. তাদের সাথে কাজ করি দুই বছর. দলে ছিলাম আমি একমাত্র বাংলাদেশী. তো স্বাভাবিক কারণেই সুইডেনে পড়ুয়া আগ্রহী সব বাংলাদেশী স্টুডেন্ট আমার সাথে যোগাযোগ করতো. তার পাশাপাশি ভারতীয়, নেপালি, পাকিস্তানিরাও আসতো. বলা বাহুল্য যে বাংলাদেশিদের কাছ থেকে সেই দুই বছরে আমি 50% প্রশ্ন পেয়েছি এই রকম – “ভাই ঐখানে এসে কি সেটেল হওয়া যাবে?”, “ভাই চাকরি পাইলেই কি সেটল হওয়া যাবে?”, “ভাই শুনেসি 30 ক্রেডিট করলেই নাকি চাকরি পাওয়া যায়. সত্যি নাকি?”, “ভাই PR পাইতে কতদিন লাগে?”, “ভাই এসে কি অন্যদিকে যাওয়া যাবে?” …
তো এতকিছু বলার কারণটা কি? আশা করি কিছুটা হলেও ধাঁচ করতে পারছেন. আমাদের দেশের অনেক ছাত্রই বিদেশে পারি জমানোর স্বপ্ন দেখে. মনে করে যে বাইরে পা ফেলতে পারলেই লাইফ সেট. সেই ভাবনাটা অনেক ক্ষেত্রে ঠিক আবার অনেক ক্ষেত্রে ভুল. বিদেশে আসার মূল উদ্দেশ্যটাই যদি কোনোভাবে PR পেয়ে সেটেল হওয়াই হয়, তাহলে বিসমিল্লাতেই গলদ আছে. আজ সেটা নিয়েই লিখছি.
বিদেশে আসার কারণটি হতে হবে পড়াশোনা এবং ক্যারিয়ার. নিজেকে সবার আগে দুইটি প্রশ্ন করবেন – কি পড়তে আসতে চাচ্ছেন এবং আপনার পড়াশোনা করার উদ্দেশটা কি? প্রথম টার্গেটই হতে হবে পড়াশোনা শেষ করা এবং করে সেখানেই একটা ভালো সম্মানজনক চাকরি নিয়ে ক্যারিয়ার তৈরী তে লেগে পড়া. সেটা যদি করার ইচ্ছা থাকে, তাহলে আপনাকে আর লাইফ এ কোথাও সেটেল হওয়ার চিন্তা করতে হবে না. এমনকি এটা আপনার মাথায়ও আসবে না. একবার যখন নিয়মের মধ্যে পরে যাবেন, দেখবেন যে বেশ ভালো স্ট্যান্ডার্ডের একটা জীবিকা অর্জন করতে পারছেন – ভালো পয়সা, ভালো সম্মান ও ভালো সুযোগ. সেটা নিয়ে মগ্ন থাকতে থাকতে দেখবেন যে আস্তে ধীরে সেই দেশের PR টাও হয়ে যাবে. কোথায় দিয়ে বছর পার হয়ে গেলো, টেরও পাবেন না. কিন্তু এসব বসে ঘাস কাটলে কখনোই আসবে না. পরিশ্রম করতে হবে, প্ল্যান করতে হবে এবং দিনরাত চেষ্টা করতে হবে. সবার উপরে, সেই খাটনি করে একটা ভালো জীবন অর্জন করার ইচ্ছা থাকতে হবে.
এখন ধরেন যে পড়াশোনা করে আপনি তেমন কোনো সুবিধা করতে পারছেন না. চাকরি নাই বা PHD করার সুযোগ পাচ্ছেন না. শেষমেশ না হলে আপনাকে দেশেই ফেরত আসতে হবে. কিন্তু তাতে ক্ষতিটা কি? কমপক্ষে একটা বিদেশী ডিগ্রী নিয়ে দেশে ফিরে আপনি কিছু না কিছু করতে পারবেন. চাকরি করতে পারবেন নাহলে ইনোভেটিভ কোনো ব্যবসা. কমপক্ষে সম্মানজনক ভাবে খেয়ে বাঁচতে পারবেন. এটাও সম্বভ যে আপনি আবার চেষ্টা করলেন বিদেশে যাওয়ার. কি বলেন, 1 ইউরো দিয়ে পানি বিক্রি বা স্টেশনে খেলনা বিক্রি করে কষ্ট করার থেকে তো ভালো নাকি? বা দিনরাত পুলিশের বা মাইগ্রেশন বোর্ডের দৌড়ানি খাওয়া থেকে? এটা ঠিক যে হয়তো কোনো না কোনো দিন আপনি সেই পানি বা খেলনা বিক্রি করতে করতে অথবা পুলিশের দৌড়ানি খেতে খেতে সেই দেশের নাগরিক হয়ে যাবেন. কিন্তু নিজেকে প্রশ্ন করেন – এই নাগরিকত্বতার দামটা কতটুক? জীবনে কতদূর এই নাগরিকত্বতা আপনাকে নিয়ে আসলো? যেই দেশ ছেড়ে ভালো একটা জীবনের জন্য বিদেশে এসেছিলেন, সেই তুলনায় কি আজকে ভালো আছেন?
“তার মানে কি ভাই, সেটেল হওয়া কি পাপ নাকি?” – অবশ্যই না. সেটেল হওয়ার প্ল্যান ঠিকই থাকতে হবে, কিন্তু সেটাকে আপনার মূল উদ্দেশ্য বানাবেন না এবং সেটার উপর ভিত্তি করে বিদেশ আসবেন না. নিজের priority ঠিক করুন আগে. ভালো ডিগ্রী, ভালো চাকরি, ভালো সম্মান, ভালো জীবিকা আর তারপর ভালোভাবে সেটেল. আমাদের বাংলাদেশী অনেক স্টুডেন্ট যারা বিদেশে এসে অন্যদিকে ঢুঁ মারার চিন্তা করেন, একবারও ভাবেন না যে এর ফল কারা বহন করবে. বহন করবে সত্যিকারের স্টুডেন্ট যাদেরকে আজ Latvia ভিসা দেয় না, যাদের উপর কড়া নজরদারি করে Estonia, যাদের অনেক কেই এই বছর Sweden ভিসা দেয় নাই. বহন করবে দেশের মান-সম্মান এবং দেশের নাম যেটার ঠাঁই হবে এম্বেসী এর Black List এ. এরকম আরো অনেক উদাহরণ দেয়া যাবে.
সমস্যাটা হচ্ছে মানসিকতার. যখন আপনার টার্গেট ঠিক থাকবে, তখন আপনি নিজেই সেই টার্গেটের দিকে আগানোর পথ খুঁজে বের করতে পারবেন. সাময়িক ভাবে তাতে বাধা আসতে পারে কিন্তু তার মানে এইটা না যে হেরে গেলেন. অনেক সময় আমাদের ইচ্ছা বা প্ল্যান মতো অনেক কিছুই হয় না. তারমানে তো এইটা না যে নতুন কোনো ইচ্ছা বা প্ল্যান তৈরী করা যাবে না. এই সমস্যাটার কিন্তু কারণ ও আছে –
* শোনা কথায় কান দেয়া – আমরা বাংলাদেশিরা শুনতে খুব ভালোবাসি. “শুনেছি অমুক ভাই অমুক ভাবে বিদেশে গেসে. এখন তো বহু টাকা কামায়”.
* ঠিক মতো তথ্য যাচাই না করা – আমরা শুধু শুনেই যাই. এবার গিয়ে যে google এ বসে একটু খোঁজ নিবো, সেটার ইচ্ছা আর থাকে না.
* উদ্যোগী না হওয়া – প্রশ্ন থাকলে যারা জানে, তাদের কাছে যান. ইউনিভার্সিটি গুলোর সাথে যোগাযোগ করুন, সেখানে পড়ুয়া বড় ভাই/বোন দেড় সাহায্য নিন, বিভিন্ন আর্টিকেল পড়ুন, সেই দেশের কি অবস্থা সেটা যাচাই করুন. অলস হলে চলবে কি করে.
* বিভিন্ন এডভার্ট / নিউস গুলে খাওয়া – “২,00,000 টাকাতেই ইউরোপের/আমেরিকার স্বপ্ন পূরণ! আজই যোগাযোগ করুন”.
জি, সেই স্বপ্ন ঠিকই পূরণ হবে কিন্তু শূন্যের সাথে.. স্বপ্ন * 0 = 0.
শেষ কথায় এটাই বলতে চাই যে, অন্য পারের ঘাস ঠিক এ সবুজ দেখায়ে. বিদেশে সেটেল হওয়ার উদ্দেশে আসলেই সেটেল হওয়া যায় না. অনেক কিছু করতে হয় এবং জানতে হয়. সেদেশের ভাষা, আইন-কানুন, সিস্টেম, ট্যাক্স, জীবন-যাত্রা, শিক্ষা ইত্যাদি. সেই মূল উদ্দেশই আপনাকে দিয়ে এমন অনেক কষ্ট করাবে যেটা করতে আপনি কখনোই আসেন নাই. সেকারণে কখনোই সাময়িক সুবিধার চিন্তা করবেন না. লং-টার্ম ভাবেন. কমপক্ষে সেটার কাছাকাছি গিয়ে তো পৌঁছাতে পারবেন. ইংলিশ এ একটা প্রবাদ আছে – Reach for the stars and you will land on the moon.
Moon তাই বা খারাপ কি, তাই না?! ![]()
কোনো কথায় খারাপ লেগে থাকলে ক্ষমা করবেন. কাউকে ছোট করার জন্য এটা লেখিনি. বরং আমরা সবাই চাই আমাদের স্টুডেন্টরা দেশ-বিদেশ দাবড়ে বেড়াক. ভালো চাকরি করুক, নিজের দেশের ও বিদেশের দায়িত্বশীল একটা নাগরিক হোক এবং দেশকে বিভিন্ন জায়গায় সম্মানের সাথে তুলে ধরুক. এভাবেই দিন বদলাবে.
ভালো থাকুন. দোআ রইলো.
লিখেছেনঃ
Redwan Hasan
Studies MSc Business Analytics at University of Lausanne
Lives in Lausanne, Switzerland
……………………………………………………………………………………………………………………………………………………………………………………………………………………………………………………………
Also Visit Our (HigherStudySheba) More Free Resources:
Website: www.higherstudysheba.xyz
YouTube Channel: https://www.youtube.com/@HigherStudySheba
FB Page: https://www.facebook.com/higherstudysheba
FB Group: https://www.facebook.com/groups/1045575249683642
Linkedin: https://www.linkedin.com/company/higherstudysheba
Instagram: https://www.instagram.com/higherstudysheba/